মহান রাব্বুল আলামিনের নিয়ামতসমূহের মধ্যে পানি অন্যতম। পানি ছাড়া মানুষের জীবনধারণ অসম্ভব। কেননা পৃথিবীর সব প্রাণের উৎস পানি এবং আমরা সবাই পানির ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহতায়ালা পানিকে শুধুমাত্র মানুষের পান করার চাহিদা মেটানোর জন্যই তৈরি করেননি। পানিকে করেছেন সৃষ্টির বিভিন্ন কাজের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। এছাড়া খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সব কিছুই মানুষের জন্য ইবাদত হবে যখন এসব কাজ ইসলামি পদ্ধতিতে করা হবে। যেমন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাবার ও পানীয় গ্রহণ করা অত্যন্ত আবশ্যক। আবার জীবনধারণে পানি পান করাও আবশ্যক। পানির অপর নাম জীবন। জীবন বাঁচাতে পানি পানের বিকল্প নেই। সব সৃষ্টিরই বেঁচে থাকার তাগিদে পানি পান করতে হয়। আর মানুষের পানি পানে রয়েছে কিছু ইসলামি নিয়ম ও পদ্ধতি। কাজটি ছোট হলেও প্রতিদিন অনেকবার মানুষকে পানি পান করতে হয়। পানি পানের সময় স্বয়ং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুনির্দিষ্ট কিছু আমল করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাস্তব জীবনের এ আমলগুলো উঠে এসেছে হাদিসের বর্ণনায়। পানি পান করার সুন্নতসমূহ: ১.ডান হাতে পান করা। কেননা শয়তান বাম হাত দিয়ে পানি পান করে। (সহিহ মুসলিম ২/১৭২) ২.বসে পান করা, দাঁড়িয়ে পান করা নিষেধ। (সহিহ মুসলিম ২/১৭৩) ৩. শুরুতে (বিছমিল্লাহ) পড়া এবং শেষে (আলহামদু লিল্লাহ) পড়া। (সুনানে তিরমিযী ২/১০) ৪. তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করা, নিঃশ্বাস ফেলার সময় গ্লাস থেকে মুখ আলাদা করা। (সহিহ মুসলিম ২/১৭৪) ৫. গ্লাসের ভাঙা অংশের দিক দিয়ে পান না করা। (সুনানে আবু দাউদ ২/১৬৭) ৬. জগ ইত্যাদি বড় পাত্রে মুখ লাগিয়ে পান করবেন না। কেননা এতে বেশি পানি চলে আসার বা সাপ-বিচ্ছু থাকার সম্ভাবনা থাকে। (বুখারী ২/৮৪১, মুসলিম ২/১৭৩) ৭. পানি পান করার পর অন্যজনকে দিতে হলে প্রথমে ডান পাশের জনকে দিবেন। সেও তার ডান পাশের জনকে দিবেন, এভাবেই চলবে। চা ও অন্যান্য পানীয়ের ক্ষেত্রে এটাই নিয়ম। (বুখারী ২/৮৪০ ও মুসলিম ২/১৭৪) ৮. ওজু করার পর যে পাত্রে হাত দিয়ে পানি নেয়া হয়, সে পাত্রের অবশিষ্ট পানি কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে পান করা। এতে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি হতে আরোগ্য লাভ হয়। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ৫৬১৬) ৯. পানীয় দ্রব্য পান করে কাউকে দিতে হলে ডান দিকের ব্যক্তিকে আগে দেয়া এবং এই ধারাবাহিকতা অনুযায়ীই শেষ করা। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ৫৬১৯) আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘আর আমি প্রাণবান সবকিছু সৃষ্টি করলাম পানি হতে, তবুও কি তারা ঈমান আনবে না? (আম্বিয়া ৩০)। আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা যে পানি পান কর, সে সম্পর্কে কি তোমরা চিন্তা করেছ? তোমরাই কি তা মেঘ হতে নামিয়ে আন, না আমি তা বর্ষণ করি? আমি ইচ্ছা করলে তা লবণাক্ত করে দিতে পারি। তবুও কেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর না? (ওয়াক্বিয়াহ ৬৮-৭০)। আল্লাহ তায়ালা মাখলুক সৃষ্টিতে পানি ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন, আল্লাহ সমস্ত জীব সৃষ্টি করেছেন পানি হতে, ওদের কতেক পেটে ভর দিয়ে চলে (সাপ), কতেক দুই পায়ে চলে (মানুষ) এবং কতেক চলে চার পায়ে (জন্তু-জানোয়ার) আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্ব শক্তিমান।’ (সুরা: নুর : আয়াত : ৪৫)। আল্লাহ অন্যত্র বলেন, অবিশ্বাসীরা কি ভেবে দেখেনা যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম, এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না। (সুরা: আম্বিয়া, আয়াত : ৩০)। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের জীবিকা তথা ফলমূল তৈরিতে পরিমাণ মতো পানি দান করে থাকেন। যা ছাড়া কোনো ফলমূল উৎপন্ন হতো না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে পবিত্রসত্তা তোমাদের জন্য ভূমিকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদ স্বরূপ স্থাপন করে দিয়েছেন, আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল-ফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসেবে। অতএব, আল্লাহর সঙ্গে তোমরা অন্য কাউকে সমকক্ষ করো না। বস্তুতঃ এসব তোমরা জান।’ (সুরা: বাকারা, আয়াত : ২২)। হজরত সাহল ইবনু সা‘দ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে একটি পেয়ালা আনা হল। তিনি তা হতে পান করলেন। তখন তার ডান দিকে ছিল একজন বয়ঃকনিষ্ঠ বালক আর বয়স্ক লোকেরা ছিলেন তার বাম দিকে। তিনি বললেন, হে বালক! তুমি কি আমাকে অবশিষ্ট (পানিটুকু) বয়স্কদেরকে দেওয়ার অনুমতি দিবে? সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার নিকট থেকে ফজিলত পাওয়ার ব্যাপারে আমি আমার চেয়ে অন্য কাউকে প্রাধান্য দিব না। অতঃপর তিনি তা তাকে প্রদান করলেন। (২৩৬৬, ২৪৫১, ২৬০২, ২৬০৫, ৫৬২০, মুসলিম ৩৬/১৭, হাদিস ২০৩০, আহমাদ ২২৮৮৭)। আল্লাহতায়ালা সবাইকে নিত্যদিনের প্রত্যেকটি কাজে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ সমুহ অনুসরণ ও অনুকরণ করার তাওফিক দান করুক। আমিন।
দিনে কতটা পানি পান করা উচিত? এ নিয়ে যত ভুল ধারণা
আপনি ক্লান্ত থাকুন বা আপনার ত্বক শুষ্ক হোক এক্ষেত্রে নিরাময় হিসাবে আপনাকে সম্ভবত আরও পানি পান করতে বলা হয়েছে। কিন্তু এটি কতটা সঠিক পরামর্শ? বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, কেউ যদি সবসময় নিজের সাথে পুনঃব্যবহারযোগ্য পানির বোতল বহন করেন তাহলে অভ্যাসবশত দেখা যায় তিনি তার শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পানি পান করছেন। এক সময় মানুষকে বিশুদ্ধ পানির অভাবে তৃষ্ণা নিয়ে বাঁচতে হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখন এমন সময় এসেছে যে মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পানি পান করে। সেটা বোতলজাত পানি বিক্রি বেড়ে যাওয়া থেকেই আন্দাজ করা যায়। বেশি বেশি পানি পানের আরেকটি বড় কারণ পানি সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ছড়ানো। যেমন: প্রতিদিন বেশি বেশি পান করা সুস্বাস্থ্য, শক্তি এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা ধরে রাখার গোপন রহস্য, বেশি বেশি পানি খেলে ওজন কমবে এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস পাবে। পানির চাহিদা পূরণে ৮*৮ নিয়মটি বেশ জনপ্রিয়। এর মানে প্রতিদিন আটবার পানি পান করা এবং প্রতিবার ২৪০ মিলিলিটার পানি গ্রহণ। এতে সারাদিনে দুই লিটারের মতো পানি খাওয়া হয়। তবে এই নিয়মকে বিজ্ঞান সমর্থন করে না। একজন মানুষকে দিনে কতটা পানি পান করতে হবে সে সম্পর্কে এত অস্পষ্ট তথ্য কেন? সম্ভবত, কয়েক দশক আগের দুটি ভুল নির্দেশনা থেকে এই ভুল ব্যাখ্যা এসেছে। ১৯৪৫ সালে ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের ইউএস ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন বোর্ড প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি ক্যালোরি খাবারের জন্য এক মিলিলিটার তরল খাওয়ার পরামর্শ দেয়। অর্থাৎ কেউ যদি দৈনিক ২০০০-ক্যালরি ডায়েট করে তাহলে দুই হাজার মিলিলিটার অর্থাৎ দুই লিটার পানি খেতে হবে। তবে এই পানির মধ্যে অন্যান্য পানীয় অন্তর্ভুক্ত থাকে – সেইসাথে যেসব ফল এবং শাকসবজিতে প্রচুর পানি থাকে সেগুলোও যোগ হবে।
পানি কখন কতটুকু খাবেন
আমাদের শরীরে প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগই পানি। সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে তাই পানি পানের বিকল্প নেই। কিন্তু কতটুকু পানি পান করব সারা দিনে? কখন বেশি আর কখন কম পানি পান করা উচিত? পর্যাপ্ত পানি পানের যেমন সুফল আছে, তেমনি অপর্যাপ্ত পানি পানের কারণে পড়তে হয় নানা সমস্যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ জানিয়েছেন পানি পানের নানা টুকিটাকি। দিনে কতটুকু পানি পান করবেনপ্রাপ্তবয়স্ক ও কর্মক্ষম নারী-পুরুষের প্রতিদিন দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করা প্রয়োজন। তবে দিনে কতটুকু পানি পান করতে হবে, তা নির্ভর করে মূলত আবহাওয়া ও শারীরিক শ্রমের ওপর। শীতকালের চেয়ে গরমকালে শরীরে পানির চাহিদা বেড়ে যায় আবহাওয়ার কারণেই। আর যাঁরা কায়িক পরিশ্রম বেশি করেন, তাঁদের বেশি পানি পান করতে হবে। যারা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঘামেন, তাঁদের জন্য একটু বেশি পানি পান করা জরুরি। অনেকে মনে করেন সকালে খালি পেটে অনেক পানি পান করা ভালো। এর সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। তবে কিছু শারীরিক সমস্যায় এই অভ্যাসে উপকার পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে যখনই পানির তৃষ্ণা তৈরি হবে, তখনই পানি পান করে শরীরের ঘাটতি মেটানো উচিত। পর্যাপ্ত পানি পানের সুফলপর্যাপ্ত পানি পানে কিডনি, যকৃৎ, হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্ক ভালো থাকে। শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে। পানি শরীরের ভেতরের কোষগুলোকে সবল ও স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। পানি পানের ঘাটতি দেখা দিলে এই কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে অবশ্যই বিশুদ্ধ পানি পানের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। কেননা পান করার পানি বিশুদ্ধ না হলে ডায়রিয়া, কলেরা ও টাইফয়েডের মতো পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কমপক্ষে আধঘণ্টা ভালো করে ফুটিয়ে তারপর ঠান্ডা করার মধ্য দিয়ে পানি জীবাণুমুক্ত হতে পারে। অথবা সঠিক পদ্ধতিতে ফিল্টার করেও পানি পান করা যেতে পারে। এ ছাড়া বাজার থেকে বোতলজাত পানি কেনার ক্ষেত্রেও সেগুলো দেখে শুনে কেনা উচিত। অপর্যাপ্ত পানি পানের সমস্যাপর্যাপ্ত পানি পান না করলে মানবদেহে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। পানির ঘাটতি থেকে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। এ থেকে শরীরে রক্ত চলাচল কমে আসা এবং কিডনি অকেজো হয়ে পড়ারও আশঙ্কা থাকে। নারীদের মধ্যে অনেকে অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পান করেন। বিশেষত যাদের নানা কাজে বাইরে বেরোতে হয় তাঁদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। এর প্রধান কারণ আমাদের শহর-নগরে পর্যাপ্ত ও ভালো পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা না থাকা। আর পানি কম পান করায় তাদের ইউরিন ইনফেকশন এবং কিডনির জটিলতা বৃদ্ধি পায়। তাই দিনের বেলায় এই পানির ঘাটতি মেটাতে ঘরে ফিরে বেশি করে পানি পান করা উচিত।